হাতির দাঁতের দুটি স্তম্ভের মতো স্তুপে অগ্নিসংযোগ। (©বেন কার্টিস/এপি ইমেজেস)
কেনিয়ার নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কে হাতির দাঁতের স্তুপে অগ্নিসংযোগ, যা সংরক্ষিত প্রাণী থেকে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে সরকারের একটি জোরালো বার্তা। (©বেন কার্টিস/এপি ইমেজেস)

সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের হাতে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বন্যপ্রাণী পাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পাচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান আরো জোরালো করেছেন।

আইনের প্রয়োগ বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং বন্যপ্রাণী এবং তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চাহিদা হ্রাস করতে ২০১৫ সালে বন্যপ্রাণী পাচার বিষয়ক প্রেসিডেন্টের টাস্ক ফোর্স একটি ত্রিমুখী কৌশল সচল করে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং স্টেট এবং ইন্টেরিয়র সেক্রেটারিরা যৌথভাবে এই টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা বন্যপ্রাণী পাচার রোধে জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে ১৭টি সংস্থাকে একত্র করেছে।

২০১৯ সালের ইএনডি ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাফিকিং স্ট্র্যাটেজিক রিভিউয়ের মতে, বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১২২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে

আলমারিতে পশুর চামড়া, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও বোতল। (© রোমিও গাকাড/এএফপি/গেটি ইমেজেস)
মিয়ানমারে একটি প্রথাগত ওষুধের দোকানে বিরল প্রজাতির একটি বণ্যবিড়ালের চামড়া প্রদর্শিত হচ্ছে।  (© রোমিও গাকাড/এএফপি/গেটি ইমেজেস)

স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘ব্যুরো অফ অশনস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক অ্যাফেয়ার্স’-এর রোয়েনা ওয়াটসন বলেন, “বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধে কৌশলগত পন্থাগুলো গ্রহণে সরকার সামগ্রিকভাবে কাজ করছে ।”

সমস্যা

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা (ইউএসএআইডি)-এর বন্যপ্রাণী বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ম্যারি রোয়েনের মতে, বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে কোনো সুপরিচিত প্রজাতির হারিয়ে গেলে তাতে পর্যটনের ওপর প্রভাব পড়ে এবং যেসব দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য সম্পদ দরকার, সেসব দেশকে সেই সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে।  তিনি বলেন, “আমরা কোনো কারণেই তাদেরকে হারাতে চাই না – এটা অনেককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

সংরক্ষিত প্রজাতি – যাদের মধ্যে আছে প্যাংগোলিন, হাতি এবং গন্ডার – এগুলোর অবৈধ ও লোভনীয় বাণিজ্যের কারণ এগুলোর চাহিদা। ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তের ব্যয় সক্ষমতা বাড়ার কারণে এশিয়া, বিশেষ করে চীনে এগুলোর চাহিদা বাড়ছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ টিমের নেতৃত্ব দানকারী ওয়াটসন বলেন, “সমস্যার মূলে অবশ্যই চীন।”

আফ্রিকায় হাতি ও গন্ডারের বিরুদ্ধে অপরাধ স্থানীয়দেরকেও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এগুলো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এবং আইনের শাসন ও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া সংরক্ষণ সংক্রান্ত সাফল্যকে পর্যুদস্ত করে।  ওয়াটসন বলেন, এ ধরনের অপরাধ স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবীকা থেকে বঞ্চিত করে। খাদ্যের জন্য অন্য যেসব প্রজাতিকে শিকার করা হয় – যার মধ্যে আ্ছে প্যাংগোলিন, বানর, ইঁদুর এবং বাদুর – সেগুলো এমন রোগজীবাণু বহন করতে পারে, যা সংক্রামণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে তারপর একটি গ্রামে বা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মানুষের নখের মতো একই প্রোটিন দিয়ে তৈরি হলেও গন্ডারের শিং জোগাড় করে প্রথাগত এশিয়ান ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এগুলো আভিজাত্যের আইটেম হিসেবেও বিক্রি হয় – যেমন ব্যবহার হয় গহনায়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই ৫০৮টি গন্ডার লুট হয়েছে।

আফ্রিকার হাতি হত্যা করা হয় সেগুলোর দাঁতের জন্য, যা কারুকাজময় মূর্তি থেকে শুরু করে সাধারণ ব্রেসলেট পর্যন্ত নানারকম শিল্পবস্তু তৈরিতে ব্যবহার হয়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের হিসাব অনুযায়ী, দাঁত সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৫৫টি আফ্রিকান হাতি হত্যা করা হয়। মাঝে মাঝে হাতির চামড়া দিয়ে বসার মোড়া বানানো হয়।

প্যাংগোলিন আফ্রিকা ও এশিয়া উভয় মহাদেশে পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের হিসাব অনুযায়ী, শুধূ আঁশের জন্য ২০১৯ সালে ১,৯৫,০০০টি প্যাংগোলিন পাচার হয়েছে।  চীন ও ভিয়েতনামে প্যাংগোলিনের মাংস দামি খাবার হিসেবে বিক্রি হয়, এবং বিশ্বাস করা হয় (তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই) এই স্তন্যপায়ী প্রাণীর আঁশ প্রসূতি মায়ের দুগ্ধ বাড়াতে ও বিশেষ কিছু অসুখের সুশ্রুষায় কাজে লাগে।

এক ব্যক্তির হাতে মাথা দিয়ে রাখা প্যাংগোলিন। (© ডেনিস ফ্যারেল/এপি ইমেজেস)
পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধারের পর জোহানেসবার্গ ভেটেরিনারি হসপিটালে সুস্থ হয়ে উঠছে একটি প্যাংগোলিন। (© ডেনিস ফ্যারেল/এপি ইমেজেস)

সমাধান

বন্যপ্রাণী পাচার বিষয়ক প্রেসিডেন্টের টাস্ক ফোর্সের অংশ যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সংস্থা, সেগুলো পাচার বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে:

  • আইনের প্রয়োগ জোরালো করা: বিধিনিষেধ, আইনপ্রয়োগ ও বিচারসহ অপরাধীর বিচার সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াটির উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বন্যপ্রাণী পাচারকে একটি প্রধান আন্তঃদেশীয় অপরাধ কর্মকাণ্ড ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে গণ্য করে। এটি বন্ধে আইন বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে সহায়তা করে। ইউএসএআইডি এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট আইনপ্রয়োগ সংক্রান্ত সক্ষমতা তৈরি করে, যার মধ্যে আছে মামলা পরিচালনায় কৌসুলিদের সহায়তা করা। ইউএসএআইডির রোয়েন বলেন, “মামলার বিচার প্রক্রিয়ার উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো খাদ্য স্বয়ংসম্পন্নতায় মানুষকে আরো উন্নত অবস্থানে নিয়ে আসা।“
  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা: উচ্চ-ঝুঁকির বন্যপ্রাণীর বাজার বন্ধ করা, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং পাচারের মাধ্যমে আসা অর্থের প্রবাহ রূদ্ধ করতে অঙ্গীকার আদায়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট কূটনীতিকে ব্যবহার করে। বন্যপ্রাণী ও তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারে আকাশপথের ব্যবহার হ্রাস করতে ইউএসএআইডি এয়ারলাইন শিল্পের সঙ্গে কাজ করে।
  • চাহিদা হ্রাস: বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে পৌঁছায়, রোগজীবাণুর সংক্রমণ থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য থেকে সৃষ্ট বিপদ বিষয়ে তাদেরকে শিক্ষিত করে। কে কোন ধরনের বন্যপ্রাণীজাত পণ্য কেনে, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কেনে – তা নির্ধারণে ইউএসএআইডি চীন ও থাইল্যান্ডে প্রাথমিক গবেষণা চালিয়েছে। সেখানে পাওয়া ফলাফল ও ভিয়েতনামে এটির সহায়তায় চলমান একটি গবেষণা ব্যবহার করে ইউএসএআইডি বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন ও বাজারজাতকারীদের এমন একটি যোগাযোগ প্রচারাভিযান চালু করছে, যা ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।